শিক্ষার্থীদের চাপ কমাতে সহজ মাইন্ডফুলনেস
জানালার বাইরে অবিরাম গাড়ির হর্ন আর ভ্যাপসা গরমের মাঝে যখন পড়ার টেবিলে বসে থাকাটাই একটা বড় যুদ্ধ মনে হয়, তখন মনের ভেতরটা কেমন যেন অস্থির হয়ে ওঠে। বিশেষ করে পরীক্ষার চাপ আর অন্তহীন সিলেবাসের বোঝা যখন মাথায় চেপে বসে, তখন আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীদের মনটা ক্লান্ত হয়ে পড়া খুব স্বাভাবিক। ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকার ফাঁকে যখন আমি আমার চারপাশের ছোট ভাইবোন বা শিক্ষার্থীদের দেখি, তখন তাদের এই মানসিক ক্লান্তি আমি গভীরভাবে অনুভব করতে পারি। এই ব্যস্ত শহরের কোলাহলের মধ্যেও কীভাবে আমরা আমাদের মনকে একটু শান্ত রাখতে পারি, তা নিয়েই আজ কিছু সহজ কথা বলব।
পড়াশোনার ফাঁকে মন শান্ত করার প্রয়োজনীয়তা
পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়াটা কেবল ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইয়ের সামনে বসে থাকা নয়। দীর্ঘ সময় একটানা পড়ার পর যখন মাথা ভারী হয়ে যায়, তখন জোর করে পড়া মুখস্থ করার চেষ্টা করলে মানসিক ক্লান্তি আরও বেড়ে যায়। আমাদের মন যখন অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা আর পরীক্ষার চাপে জর্জরিত থাকে, তখন নতুন কোনো তথ্য মাথায় ঢোকা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই অবস্থায় মনের শান্তি ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। মনকে কিছুটা বিশ্রাম দিলে তা আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করতে পারে। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা কোনো কঠিন কাজ নয়, বরং এটি নিজের যত্ন নেওয়ার একটি সহজ উপায়। যখন আমরা আমাদের মনকে শান্ত করতে শিখব, তখন পড়াশোনায় মনোযোগ নিজে থেকেই ফিরে আসবে।

সহজ মাইন্ডফুলনেস চর্চা: ঘরে বসেই শুরু করার উপায়
নতুনদের জন্য মাইন্ডফুলনেস চর্চা বা ধ্যান করাটা অনেক সময় কঠিন মনে হতে পারে। অনেকেই ভাবেন এর জন্য হয়তো অনেক সময় বা বিশেষ কোনো জায়গার প্রয়োজন। কিন্তু আসলে তা নয়। খুব সহজ কিছু উপায়ে আমরা এটি শুরু করতে পারি।
-
গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম: পড়ার টেবিল বা ঘরের যেকোনো শান্ত কোণে সোজা হয়ে বসুন। চোখ বন্ধ করে নাক দিয়ে গভীর শ্বাস নিন। পেট ফুলিয়ে বাতাস ভেতরে নিন এবং মনে মনে চার পর্যন্ত গুনুন। এরপর আস্তে আস্তে মুখ দিয়ে শ্বাস ছেড়ে দিন। এই নিঃশ্বাসের ব্যায়ামটি মাত্র পাঁচবার করলেই মনের অস্থিরতা অনেক কমে যায়।
-
পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সচেতনতা: যখন খুব বেশি দুশ্চিন্তা হবে, তখন নিজের চারপাশে তাকান। এমন পাঁচটি জিনিস খুঁজুন যা আপনি দেখতে পাচ্ছেন, চারটি জিনিস যা আপনি স্পর্শ করতে পারছেন, তিনটি শব্দ যা আপনি শুনতে পাচ্ছেন, দুটি জিনিস যার ঘ্রাণ পাচ্ছেন এবং একটি জিনিস যার স্বাদ আপনি অনুভব করতে পারছেন। এটি আপনার মনকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনবে।
-
চা বা জলের স্বাদ নেওয়া: পড়ার ফাঁকে যখন এক গ্লাস জল বা এক কাপ চা খাবেন, তখন তাড়াহুড়ো না করে প্রতিটি চুমুক অনুভব করুন। জলের শীতলতা বা চায়ের উষ্ণতা আপনার ঠোঁটে এবং গলায় কেমন লাগছে, তা মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করুন। এটিও এক ধরনের সহজ মাইন্ডফুলনেস।
দৈনন্দিন জীবনে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করার ছোট ছোট অভ্যাস
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রায়ই লোডশেডিং বা যাতায়াতের সময় নষ্ট হওয়ার মতো নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। এই সময়গুলোতে বিরক্ত না হয়ে আমরা আমাদের মনকে শান্ত রাখার অভ্যাস করতে পারি।
-
যাতায়াতের সময় মন হালকা করা: রিকশায় বা বাসে যাতায়াতের সময় যখন জ্যামে আটকে থাকবেন, তখন ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে না থেকে চোখ বন্ধ করে নিজের শ্বাসের গতি খেয়াল করতে পারেন। এটি মানসিক ক্লান্তি দূর করতে দারুণ সাহায্য করে।
-
লোডশেডিংয়ের সময় নীরবতা উপভোগ: হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে অস্থির না হয়ে সেই অন্ধকার বা মোমবাতির আলোতে শান্ত হয়ে বসুন। বাইরের কোলাহল থেকে মনকে সরিয়ে নিজের ভেতরের শান্ত ভাবটিকে অনুভব করার চেষ্টা করুন।
-
ছোট ছোট বিরতি নেওয়া: টানা এক ঘণ্টা পড়ার পর অন্তত পাঁচ মিনিটের একটি বিরতি নিন। এই সময়ে কোনো ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার না করে শুধু হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্রাম নিন। এটি আপনার মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করবে।
সবশেষে বলব, পড়াশোনার চাপ থাকবেই, কিন্তু তার মাঝে নিজের মনকে হারিয়ে ফেলা চলবে না। প্রতিদিন মাত্র কয়েক মিনিটের এই স্বস্তির উপায়গুলো আপনার জীবনকে অনেক সহজ করে তুলতে পারে। নিজেকে নিখুঁত প্রমাণ করার কোনো প্রয়োজন নেই, আপনি যতটুকু পারছেন সেটাই আপনার জন্য যথেষ্ট। নিজের প্রতি একটু সদয় হোন এবং শান্ত মনে এগিয়ে যান।


